Sunday, October 26, 2014

মসজিদ

বজলুর রশীদ চৌধুরী

আমার বাড়ীর ঈশান কোণে ছোট্ট মসজিদ ঘর,
সেই ঘর থেকে ভেসে আসে আল্লাহু আকবার।
সকাল-বিকাল সবাই মোরা এই ঘরেতে যাই,
ঈমাম হুজুর বসে আছেন তাঁরই দর্শন পাই।
ছেলে-বুড়ো সবাই মোরা দ্বীনের শিক্ষা লই,
ধর্মসুতায় গাঁথা মোরা এক সারিতে রই।
আগের মানুষ পূর্ব-পুরুষ দাদার পরদাদা,
তাঁদের সাথে ছিলেন কত যাদের মন সাদা।
কষ্ট করে যত্নভরে বানিয়েছেন ঘর যাঁরা,
তাদের লাগি দোয়া মাঙি নাজাত পাক তাঁরা।
নামাজ পড়ে তসবীহ হাতে এই ঘরেতে বসি,
ধ্যানের চোঁখে চেয়ে দেখি রহমত পড়ছে খসি।
আজানের ঐ মুধর সুর যখন আসে কানে,
সর্বকর্ম ছেড়ে দিয়ে ছুটি মসজিদ পানে।
বেহেস্তের ঐ ফুল বাগিচা আমার মসজিদ ভাই,
মসজিদ আমার দ্বীনের আলো, মসিজদ আমার ঠাঁই।
গ্রামবাসী দেশবাসী দোয়া মাঙি হায়,
মসজিদের ঐ দাতা যেন স্বর্গ সন্ধান পায়।
দ্বীন-দুনিয়ার মালিক তুমি ওহে দয়াময়,
পূর্বসূরীর তরে যেন বেহেস্ত নসীব হয়।
তোমার আশিক তোমার মাসুক বানিয়েছেন এই ঘর,
তাঁদের দান কবুল কর, করিওনা গো পর।
ধনী দূর্জন কত সুজন এই ঘরেতে আসে,
ধনী-নির্ধন নাই ভেদাভেদ সবাই সবার পাশে।
মালিক তুমি মনিব তুমি, তুমি আমার সব,
তুমি বিনে এ ভূবনে আর কেহ নয় রব।
ইহলোকের রহমত আমার পরকালের সাক্ষী
শেষ বিচারের নিদানকালে মসজিদ যেন দেখি।
মসজিদ আমার ধ্যানের ধ্যান মসজিদ আমার প্রাণ
মসজিদ আমার জীবন প্রদীপ মসজিদ খোদার স্থান।
যত্ন করে রাখব তারে মনের মণি কোঠায়,
ধনী-গরীব যত মোমিন আসেন ভাই সেথায়
লা-শরীকের জিকির শুনে শুয়ে নিদ্রা যাই,
মসজিদের ঐ পাশে আমি-আমার কবর চাই।

লেখক- মিশিগান, যুক্তরাষ্ট্র


স্বপ্নের সাধু

বজলুর রশীদ চৌধূরী

সাধু ওরে আয়রে ঘরে যাস্নে চলে ভাই,
মিঠাই-মন্ডু এনে দেব খেয়ে নিস্ যা চাই।
নাড়– দেব মুড়ি দেব আরো দেব খই,
তারই সাথে দুধভাত চাঁপা কলা দই।
তোর সাথে খেতে আমার বড় ভাল লাগে,
চট্ জলদি খেয়ে তুই পড়তে যাস্ আগে।
গোসল করে জামা পরে আয় ভাই আয়,
ইশ্কুলেতে পড়তে যাবি,-সুখী হবি তায়।
সুন্দর সুন্দর জামা দেব যাবি তুই পরে,
বড় বিদ্যান হবি তুই,- দোয়া করি তোরে।
তুই আমার মনের বাতি,- তুই আমার আশা,
তুই ছাড়া কেউ নাই,- সব গেছে ভাসা।
লেখা-পড়া করবি তুই, বড় লোক হবি,
গাড়ী-ঘোড়া চড়বি ভাই, সুখের মাঝে রবি।
মা-বাবা মরে গেছে পাইনি পড়ার স্বাদ,
তোকে নিয়ে সকল আশা, বাঁধবো সুখের বাঁধ।
ঘরের ভিতর মেঘের পানি, পঁচা ছনের ছাই,
এই মেঝেতে তোরে ‘দিছি’ এক কোনেতে ঠাঁই।
আমি থাকি তোর পাশে বাঁশের ছাতি ধরি,
মেঘ-বৃষ্টি কত পড়ে ছালের ছন ঝরি।
এক টুকরো রুটির লাগি কত কাজ করি,
সারাদিন বোঝা বয়ে সন্ধ্যায় ঘরে ফিরি।
কাজের মাঝে বারে বারে ‘ভাইয়ের’ মূখ আসে,
পথ পানে ছেয়ে আছে,- কেউ নাই তার পাশে।
ভাইয়ের মূখ দেখে আমার আঁৎকে উঠে বুক,
না খেয়ে ভাই বসে আছে, শুকিয়ে গেছে মূখ।
দোকানের ঐ শুকনো রুটি নিত্য দিনের খাবার,
এর চেয়ে অধিক কিছু নাইকো- মোদের পাবার।
চিড়া মুড়ি গুড় দিয়ে র্ভছি আমার ঝুলি,
আয় ভাই খেয়ে মোরা করি গলাগলি।
ভাই আমার বড় হবে থাকবেনাকো ‘দুখ’,
শুভ দিন সামনে আছে, দেখবো সুখের মূখ,
আশার জাল বুন্ছি আমি, - আশার দিন গনি,
নিদান আমার চলে যাবে, উঠবে দিন মনি।
ঘুমের ঘোরে কত স্বপন দেখি আর জাগি,
ভাই আমার বিদ্যান হয়ে আসছে ‘ভাই’র লাগি।
মা-বাবার নাম রাখবে ছোট্ট ভাই সাধু,
মিনত সুরে আরজ করে বড় ভাই আদু।

লেখক ঃ মিশিগান, যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী।

‘শিশুর ভাষা’


বজলুর রশীদ চৌধূরী

দূরন্ত এক শিশু আমি চলছি অবিরল,
সাগর নগর দেখব আজি মাতিয়ে ধরাতল।
কচি বয়সে বাসা আমার শিশু সোহাগ নাম,
মন পবনের ঘোড়া চড়ে ঘুরি শহর গ্রাম।
মায়ের হে বাবার আদর সদা বয়ে চলি,
তাঁদের মুখের শেখা ভাষা রপ্ত করে বলি।
পাশে বসিয়ে খেতে দেয় মা-মুখে মিষ্টি হাসি,
একটু কিছু হলেই তাঁর অশ্রু পড়ে ভাসি।
লেখা-পড়ায় কৃতি ছাত্র-তিনের ভিতর নাম,
বিদ্যালয়ের সেরা পড়ুয়া-সবার কাছে দাম।
মাঠের খেলায় মগ্ন থাকি রবির আঁচল ধরি,
গোধুলি গায়ে মেখে শিশির চাদর পরি।
পাড়ায় পাড়ায় হৈ হল্লা সঙ্গী সাথী লয়ে,
বেলা শেষে ঘরে ফিরি গাঁয়ের ধূলো বয়ে।
ছুটির দিনে মামার বাড়ী স্বাধীনভাবে চলি,
আঁকা বাঁকা কত পথ কাদা পায়ে দলি।
নিজ গাঁয়ের গৌরব করি মামার বাড়ী গিয়ে,
মামার দেশের কল্প কথা সংগে আসি নিয়ে।
কচি কিশোর শিশু আমি উড়ায় পাড়াল মন,
অজানাকে জানার ইচ্ছায় ছুটি সারাক্ষণ।

লেখক-মিশিগান, যুক্তরাষ্ট্র।

Tuesday, October 21, 2014

‘আমার পাঠশালা’

বজলুর রশীদ চৌধুরী

বাল্যকালের অতীত দিনে ভেসে বেড়ায় মন,
পাড়ায় পাড়ায় দৌড়-ঝাঁপ, খেলতাম সারাক্ষণ।
মায়ে খেদানো বাপে তাড়ানো নিত্যদিনের বিষয়,
শাসন ভাষন যতই চলুক, খেলতে আমার হয়।
পাঁচের উপর বয়স আমার কবে হয়ে গেল,
বর্ণমালার একটি বর্ণ মুখে নাই এল।
এমন দিনে আদর করে মা বলেন ডেকে,
বড় বিদ্যান হবি খোকা, লেখাপড়া শিখে।
যাদু আমার মাণিক আমার আয় সাথে আয়,
পাঠশালাতে যাবি তুই, ঐ যে দুরের গাঁয়।
হেঁটে হেঁটে যাবি বাপ, আমি থাকবো চেয়ে,
সঙ্গে আরো কত আছে, যাবে তোকে নিয়ে।
বড় চিন্তা ঢুকে গেল কচি মাথার ভিতর,
স্কুল কেমন মাস্টার কেমন, কে জানাবে খবর।
পরদিন সকাল বেলা মাকে সাথে করে,
রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে থাকি, অজানা এক ডরে।
আঁকাবাঁকা রাস্তা এই, গেছে অনেক দূর,
ক্ষেতের ফসল কাটছে চাষী, কণ্ঠে তুলে সুর।
কত মানুষ আসে যায় এই পথ ধরে,
তাদের পিছে আমিও যাচ্ছি, পাঠশালার তরে।
এমন সময় রহিম উদ্দিন পিছন থেকে ডাকে,
আমরা যাচ্ছি পাঠশালা, সঙ্গে নেব তোকে।
দূরের গাঁয়ে চেয়ে দেখি লাল টিনের ঘর,
এটিই আমার পাঠশালা, বাল্য শিক্ষার বর।
প্রথম মানের ছাত্র আমি, সঙ্গে আরো কত,
স্বরে ‘অ’ স্বরে ‘আ’ পড়ি অবিরত।
ছুটি হলে খুশী মনে বাড়ী ফিরে আসি,
পথের পাশে মা দাঁড়িয়ে মুখে মিষ্টি হাসি।
তেঁতুল বিচি ধুলো মাটি সঙ্গে নেওয়া চাই,
তা না হলে কঠিন শাস্তি, দিবেন গুরুমশাই।
বর্ণলিখে সংখ্যা শিখে, আঙ্গিনাতে চলি,
ছুটির পূর্বে শতকিয়া মুখে মুখে বলি।
ধূলির উপর যত লেখা, বানান আসল খুঁটি,
শেষ বছরের পরীক্ষায় দ্বিতীয় মানে উঠি।
খাগার কলম হরিতকি বনলতার রস,
এসব দিয়ে কলাপাতায় লিখি খস খস।
যোগ-বিয়োগ-পূরণ-ভাগ পাঠশালার পড়া,
শুভঙ্করের ফাঁকি আছে, সঙ্গেঁ গন্ডা কড়া।
নামতা-অংক শিক্ষা-শ্র“তলিপির পাঠ,
হরহামেশার সবক এটি, যেন বিদ্যার মাঠ।
ছোট্ট কুঠির পাঠশালা মোর, বিদ্যাপিঠের গুরু
এখানে মোর বাল্য কৈশোর, লেখা পড়ার শুরু।
গাঁয়ের আরো কত ছেলে, এক সাথে যাই,
সুযোগ মত পিয়ারা লিচু চুরি করে খাই।
বরই গাছের পাতি ডালে কত বরই পাঁকা,
কচি মুখে লালা ঝরে, ধৈর্য যায়না রাখা।
কত সাথী ফেল করে, কত যায় ছেড়ে,
পাঠশালাতে আসে না আর, পড়ার যুদ্ধে হেরে।
ফেলে আসা দিনগুলি বারে বারে উঠে,
রেখে যাওয়া স্মৃতি ভাসে, আমার মনের তটে।
সাথী আসে সাথী যায় বিরহের জ্বালা,
পাশ দিয়ে রেখে এলাম, আমা-র পাঠশালা।

মিশিগান, যুক্তরাষ্ট্র।










“মা”

-    বজলুর রশীদ চৌধূরী
মায়ের কথা মনে হলে চোখে আসে জল,
মা-ই আমার পরম শান্তি, মা-ই গায়ের বল।
মা আমার মাথার মনি, মাকে ভালবাসি,
সকল দুঃখ দুরে যায়-দেখলে মায়ের হাসি।
মায়ের কোলে মহাশান্তি, সাধু-শাস্ত্র কয়,
মা বিহনে ত্রিভূবনে আপন কেহ নয়।
কত কষ্টে থাকে মা সন্তান পেটে ধরে,
হাজার চিন্তার ‘চিন্তী’ সে সন্তানের তরে।
মায়ের গর্ভে থাকে সন্তান মায়ের রক্ত খেয়ে,
সকল দুঃখ ভূলে মা সন্তান কোলে পেয়ে।
দশ মাস দশ দিন মায়ের গর্ভে রয়,
অশ্র“ দিয়ে দিন গণে মা কি জানি কি হয়।
উঠতে বসতে পারেনা মা গায়ে নাহি বল,
খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলে তবু,-হাসে খল খল।
মাথা ঘুরে পড়ে  মা গায়ে ভীষন জ্বর,
সন্তান তবু বুকে রাখে, করেনা গো পর।
পঁচা ঘায়ে গন্ধ ভাসে-সবাই করে ঘীন,
মা যে তার কত আপন বাসেনা গো ভীন।
প্রসবকালে মা জননীর কত কষ্ট হয়,
মা-ই জানে মায়ের বেদন অন্য কেহ নয়।
দুঃখ কষ্ট যত পায়, -সব যায় চলে,
সন্তান যদি দেখে মা হাসছে তাঁর কোলে।
না খেয়ে মা নেতিয়ে গেছে, শুকিয়ে আছে মুখ,
তবু, মা পায়না ব্যথা ভাবে শিশুর সুখ।
অনাহারে পড়ে আছে সন্তান কোলে ধরে,
সকল সুখ বিলিয়ে দেয় সন্তানের তরে।
আহার বিহার ছাড়ে মা একটু কিছু হলে,
যত স্বপন আছে মায়ের ভাসে নয়ন জলে।
মল মূত্র ধুঁয়ে মায়ের পঁচে দুই হাত,
অহোরাত্র কাটায় মা সন্তানের সাথ।
অলি-আউলিয়া-মনি ঋষি- নবী পয়গম্বর,
মায়ের নামে সবাই তাঁরা জগতে অমর।
এই নামেতে মহা প্রেম, এই ডাকেতে মধু,
এই নামেতে মহাতুষ্ট শহর-পল্লীর বধু।
মায়ের বচন অমীয় বাণী ধর্ম শাস্ত্র কয়,
মায়ের কোলে শিশুর হাসি সূর্য তুচ্ছ হয়।
কানা-বোবা নুলা ন্যাংড়া হউক অঙ্গহীন,
মহামায়ায় কোলে নেয় মা- করেনা গো ঘীন।
মায়ের কোলে মহাশান্তি, বেহেস্ত পায়ের নীচে,
এই কথাটির মহা অর্থ ধর্মশাস্ত্রে আছে।
মায়ের কথা স্মরণ করে ডাকি দয়াময়,
আমার মায়ের তরে যেন বেহেস্ত নসীব হয়।
লেখক: মিশিগান, যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী।

মহা সৃষ্টি

-    বজলুর রশীদ চৌধূরী

স্রষ্টার মহাসৃষ্টি দেখলে অবাক লাগে,
নিজ হাতে বানিয়ে তিনি দিচ্ছেন সবার ভাগে।
মহাবিশ্ব সাজিয়ে রাখছে কত বর্ণের বাগান,
যিনি ইহা দান করেছেন, গাহি তাঁর গান।
মন ক্যামেরায় গৃহবন্দী বিশ্বভূবণ সারা,
নীল আকাশের নীল দরিয়ায় ভাসছে গ্রহতারা।
তারায় তারায় আলোর মেলা, শনি ধুমকেতু,
সপ্তমন্ডল ধ্রুবতারা ছায়াপথ সেতু।
সূর্য শাসক শাসন করে স্ব-আসনে বসি,
সৌর জগৎ সালাম জানায় ধরে ঘৃষ্ট রশি।
ভূবন ভূবন নাহি দর্শন অনন্তকাল ধরে,
মহাশক্তির আদেশে, ওরা থাকে দূরে দূরে।
সূর্য সম্রাট আরো আছে, বিজ্ঞান পিতার মত্,
ওদের সাথে ঝুলে আছে আরো অনেক জগৎ।
মহাকাশের মহা সূড়ং  অতি ভয়ংকর,
স্রষ্টার ঐ কত সৃষ্টি নিমিষে দেয় কবর।
অন্ধকার ঐ মহা গহ্বর এত শক্তি ধরে,
মহাটানে সর্বগ্রাসী খাচ্ছে উদর ভরে।
মূখ-বিবরে টানছে সব, গিল্ছে অবিরাম,
সংকোচনে বিশাল আকাশ,- চলছে ইহার কাম।
উল্কাপিন্ড বেগে চলে,- রেগে থাকে বুঝি !
মহাকালের ভয়াল দিন গনে গনে খুঁজী !
আপন পথে ঘুরছে ওরা নিত্য নিরাকার,
হাসছে কোথাও নীল আকাশ, কোথাও অন্ধকার।
বিশ্ব বিহার করছে ওরা, চলছে দিবারাত,
বাঁধনহারা নয়গো ওরা, সবাই সবার সাথ।
সাগর বিহার করে যাচ্ছে আকাশের ঐ চান,
অমাবশ্যা পূর্ণিমাতে ডাকে ভয়াল বান।
জোয়ার ভাঁটা জলোচ্ছাস আনে কত ক্ষয়,
নবীন প্রবীন কত প্রাণের জন্ম মৃত্যু হয়।
ঝড় ঝন্ঝার আপদ বয়ে বায়ূমন্ডল চলে,
বায়ূদ্বারা বিশ্ব বিজয় বিজ্ঞানী যায় বলে।
আগুন-পানি-বাতাস ভরা বিশ্ব হবে ছাই,
ধ্বংস হবে সর্বভূমি,- থাকবেনাকো ঠাঁই।
সর্বজান্তা বিশ্বপতি মহা শক্তিধর,
সে ভিন্ন কার সাধ্য জানে সব খবর। #
লেখক ঃ মিশিগান, যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী।